করোনা ভাইরাস!!!


বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ ও গবেষক মাওলানা মোঃ মাহমুদুল হক, ঢাকা সেনানিবাস কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ।

#করোনা_মুসিবত_আমাদের_করণীয়ঃ

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

ক) প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। (সুরা আলে ইমরান-১৮৫, সুরা আনকাবুত-৫৭)

খ) তোমরা যেখানে থাক না কেন মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই, যদিও তোমরা মজবুত দুর্গে অবস্থান কর। (সুরা নিসা-৭৮)

গ) বল, তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সে মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে। (সুরা জুমআ-০৮)

ঘ) আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা এবং ধন, প্রাণ ও ফল-ফসলের ধ্বংস/অভাবের কোন একটি দ্বারা পরীক্ষা করবো। ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করুন, যাদের উপর বিপদ-মুসিবত আসলে তারা বলেঃ নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং তারই দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন। (সুরা বাকারা-১৫৫-১৫৬)

মৃত্যু অনিবার্য, শ্বাশত ও চিরন্তন। মৃত্যুকে প্রতিরোধ করা যায় না-যাবে না। মৃত্যু সমস্যার কোন সমাধান নেই। সকল মানুষকে মরতে হবে। মৃত্যুর কাছে সবাই অসহায় ও পরাজিত। মৃত্যুর উর্ধ্বে একমাত্র মহান স্বত্তা আল্লাহ। এমনকি মালাকুল মওতকেও মৃত্যু বরণ করতে হবে। শক্তি, ক্ষমতা, পদমর্যাদা, ধন-সম্পদ কোন কিছুর বিনিময়ে/দ্বারা মৃত্যুকে ঠেকানো বা পিছানো যাবে না। আর মৃত্যু কারো অনুমতি নিয়েও আসবে না। দুনিয়ার সময় প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট। যথাসময়ে চলে যেতেই হবে।

মানুষ দ্বৈত স্বত্তার অধিকারী সৃষ্টি। তার রয়েছে দেহ ও আত্মা। দেহ ও আত্মার সহাবস্থানই জীবন। আর মৃত্যু হলো দেহ ও আত্মার বিচ্ছিন্নতা। এর প্রকৃত রহস্য আল্লাহই জানেন। মৃত্যুর জন্য কোন কারণ বা আসবাব থাকা জরুরী নয়, তবে যে কোন কারণের সাথে মৃত্যুর সম্পর্ক করা জায়েয।

মরতে হবে-মরে যাব, তার মানে এই নয় যে আমি মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করবো বা মৃত্যু কামনা করবো কিংবা নিজেকে বিপদ, মুসিবত ও ধ্বংসের মাঝে নিমজ্জিত বা নিক্ষেপ করবো। এর প্রত্যেকটি ইসলামে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

ক) তোমরা নিজেকে হত্যা করো না। (সুরা নিসা-২৯)

খ) তোমরা নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না, তোমরা সৎকর্ম করতে থাকো, নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সুরা বাকারা-১৯৫)

গ) হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে সার্বিক কল্যাণ দাও এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো, আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে রক্ষা করো। (সুরা বাকারা-২০১)

রসুলুল্লাহ সঃ বলেছেনঃ

ক) তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। (বুখারী, মুসলিম)

খ) তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে এবং তা আসার পূর্বে যেন তার জন্য দুআ না করে। (মুসলিম)

গ) তোমাদের কেউ যেন কোন বিপদ-মুসিবতের জন্য মৃত্যু কামনা না করে। (বুখারী, মুসলিম)

ঘ) আর তোমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাও। (বুখারী, মুসলিম)

ঙ) অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ ব্যক্তির কাছে নেয়া/উপস্থিত করা যাবে না। (বুখারী, মুসলিম)

চ) কোন এলাকায় তোমরা মহামারির সংবাদ শ্রবণ করলে সেখানে প্রবেশ করবে না। আর কোন এলাকায় থাকা অবস্থায় যদি মহামারি শুরু হয়, তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না। (বুখারী, মুসলিম)

ছ) বনী সাকীফ গোত্রের একদল লোক বাইয়াত করতে আসলে তাদের মধ্যে একজন কুষ্ঠ রোগী ছিল, রসুলুল্লাহ সঃ অসুস্থ লোকটিকে কাছে আসতে দেন নি। (মুসলিম)

জ) কেউ নিজের ক্ষতি করবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না। (সুনান ইবনে মাজাহ)

আমরা মুসলিম কি অমুসলিম সারা দুনিয়ার সকল মানুষ একটি কঠিন ও বিপদজনক সময় অতিবাহিত করছি। আজ আমরা সকলে করোনা ভাইরাসের মহা মুসিবতে আক্রান্ত। মৃত্যুভয়, আশংকা ও পেরেশানির মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিটি মূহুর্ত কাটছে। গোটা দুনিয়াবাসী একসাথে এ ধরণের মুসিবতে কখনও পড়েনি। নিঃসন্দেহে এটা মানুষের কৃত কর্মের ফল-ফসল। কারণ, পৃথিবীর জলে-স্থলে যে কোন বিপর্যয় ও মুসিবত মানুষের কৃতকর্মের জন্যই হয়ে থাকে (সুরা রুম- ৪১)।

অন্যায়-অপকর্ম, যুলুম-অত্যাচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ-উচ্ছেদ, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা, হত্যা-খুন-গুন, ধর্মপালন ও বাকস্বাধীনতা হরণ, যেনা-ব্যাভিচার, মদ-মাদকতা, সুদ-ঘুষ-কালোবাজারী-মজুদদারী, নারী-শিশু ও দুর্বলদের প্রতি অত্যাচার, ধোকা-প্রতারণা, প্রহসন ইত্যাদি নানা অন্যায়-অপকর্মে আজ গোটা দুনিয়া জর্জরিত নিমজ্জিত। এ অবস্থায় বড় ধরণের বিপদ-মুসিবত, ব্যধি ও মহামারি আঘাত হানা বিচিত্র কিছু নয়।

করোনা মুসিবতের কোন প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত মানুষের হাতে নেই। তাই এই মহা মুসিবত থেকে হিফাযত ও রক্ষার জন্য আমাদের তথা গোটা দুনিয়াবাসীর উচিত হলো বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তার আনুগত্য মেনে নিয়ে, তার হুকুমের আলোকে জীবন পরিচালনা করা। এ অবস্থায় আমাদের যা কিছু করা প্রয়োজন তা হলোঃ

০ নিজের ঈমান ও আমলকে সংশোধন ও সুসংহত করা এবং জীবনের সকল পর্যায় থেকে সকল মন্দ বিষয় পরিত্যাগ করা।

০ আল্লাহর নিকট বেশী বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তাওবা করে তার আনুগত্যে ফিরে আসা এবং এ বিপদ থেকে রক্ষা ও হিফাযতের জন্য আল্লাহর কাছে বেশী বেশী দুআ করা ও তাওয়াক্কুল রাখা।

০ সলাত, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ ও যিকিরে আত্মনিয়োগ করা।

০ হালাল ও পবিত্র খাদ্য খাওয়া এবং যাবতীয় হারাম বর্জন করা।

০ ভীত ও আতংকিত না হয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকা এবং সকলকে সতর্ক ও সচেতন করা। সর্দি-জ্বর হলে আতংকিত না হয়ে শান্ত থাকুন এবং ডাক্তারের সাথে কথা বলে ঔষধ খান, সেরে উঠবেন- দুশ্চিন্তা করবেন না। অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করবেন, অস্থির হবেন না।

০ ঘরে নিজে বা কেউ অসুস্থ হলে পৃথক রুমে থাকুন/রাখুন, ইনশাআল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবেন।

০ নিজে সর্বদা পবিত্র ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, ঘর-বাড়ী ভিতর ও বাহিরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। এ জন্য ডেটল/সেভলন/স্যানিটাইজার/ ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করুন।

০ কিছুক্ষণ পর পর অযু করে দুই রাকাত সলাত পড়ুন। এতে আপনার হাত ধোয়া হয়ে যাবে।

০ সর্বদা ঘরের ভিতরে অবস্থান করা, জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া।

০ পরিমিত খাবার খান, পর্যাপ্ত পানি পান করুন, দিনে কমপক্ষে চারবার আদা-লং-লেবু মিশ্রিত চা পান করুন।

০ পরিবারকে সময় দিন, সবার সাথে আনন্দে থাকুন, বই পড়ুন, গল্প বলুন, আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।

০ কারো সাথে মুসাহাফা/করমর্দন/কোলাকুলি না করা।

০ বাইরে যে কোন লোকের সাথে কমপক্ষে তিন ফিট দুরত্ব বজায় রেখে কথা বলা ও অবস্থান করা। যে কোন ভীড় এড়িয়ে চলুন, পাবলিক যানবাহনে উঠবেন না, পায়ে হেটে চলুন।

০ বাইরে যেতে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা এবং ঘরে ফিরে সাবান দিয়ে হাত পা ভালোভাবে ধৌত করে অযু/গোসল করা ও পরিধেয় কাপড় পরিবর্তন করে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা।

০ আপাতত মসজিদে না গিয়ে বাসায় সলাত আদায় করুন।

০ ডাক্তারগণের পরামর্শ মেনে চলুন এবং আপনার পরিচিত ডাক্তারগণের সাথে যোগাযোগ রাখুন।

০ আপাতত আপনার বাইরে থেকে আসা কাজের লোকদের অগ্রিম বেতন দিয়ে ছুটি দিয়ে দিন।

০ বেশী বেশী দান-সাদাকা করুন। এ অবস্থায় দরিদ্র মানুষগুলোকে ক্ষুধা ও করোনা দুটি মুসিবতের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মনে রাখবেন, দান-সাদাকা বিপদ দুর করে।

০ কোন প্রকার গুজবে কান দিবেন না। সোস্যাল মিডিয়ার সব তথ্য/বক্তব্য সঠিক নয়। কারো সমালোচনায় সময় নষ্ট না করে পারলে নিজে কিছু করুন। সকলকে সাহস ও সৎপরামর্শ দিন।

০ সবার জন্য দুআ করুন।